অমিত চন্দ্র পাল, সিনিয়র রিপোর্টার: একসময়ের শীতপ্রধান জেলা হিসেবে পরিচিত কুড়িগ্রাম জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। উত্তরাঞ্চলের এই সীমান্তবর্তী জেলায় গ্রীষ্ম মৌসুমে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, তীব্র খরা ও অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। চলমান তীব্র দাবদাহে একদিকে যেমন জনজীবন বিপর্যস্ত, অন্যদিকে ঘরে ঘরে বাড়ছে নানা রোগব্যাধি। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী, দিনমজুর এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান তাপপ্রবাহে কুড়িগ্রামে ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা, হিট স্ট্রোক, চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনিজনিত জটিলতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের প্রকোপও।
কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. নিসর্গ মেরাজ চৌধুরী বলেন: “তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয়। অতিরিক্ত ঘাম, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং গরমে খাবার দ্রুত নষ্ট হয়ে দূষিত হওয়ার কারণে বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন।”
তীব্র দাবদাহে সুস্থ থাকা যাবে বিশেষজ্ঞদের এই পরামর্শগুলো মানলেই-
* পর্যাপ্ত পানি পান: তীব্র গরমে পানিশূন্যতা রোধে প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে কমপক্ষে ৩ লিটার এবং শিশুদের ১.৫ থেকে ২ লিটার নিরাপদ পানি পান করা উচিত।
* ডায়রিয়া ও স্যালাইন: দিনে তিনবারের বেশি পাতলা পায়খানা হলে দ্রুত খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। অবস্থার উন্নতি না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
* হিট স্ট্রোক প্রতিরোধ ও করণীয়: দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। শরীর অতিরিক্ত গরম হওয়া, মাথা ঘোরা, বমি ভাব, দ্রুত হৃদস্পন্দন বা অজ্ঞান হওয়ার মতো লক্ষণ দেখলে রোগীকে দ্রুত ছায়াযুক্ত স্থানে নিয়ে শরীর ঠান্ডা করতে হবে এবং অবিলম্বে হাসপাতালে নিতে হবে।
* ত্বকের যত্ন: চর্মরোগ ও ছত্রাকজনিত সংক্রমণ থেকে বাঁচতে অতিরিক্ত ঘাম এড়িয়ে চলতে হবে এবং শরীর সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
* বিশেষ সতর্কতা: হাঁপানি, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং কিডনিজনিত দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীদের এই গরমে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
* জ্বরের ক্ষেত্রে অবহেলা নয়: কয়েক দিন ধরে টানা জ্বরের সঙ্গে তীব্র মাথাব্যথা বা শরীরব্যথা থাকলে তা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া বা টাইফয়েডের লক্ষণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
তীব্র গরমে মাঠপর্যায়ে খেটে খাওয়া মানুষজন সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। নাগেশ্বরী উপজেলার দক্ষিণ রতনপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জলিল জানান, প্রচণ্ড গরমে মাঠে কাজ করার সময় তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান রাজারহাট উপজেলার ওমর মজিদ গ্রামের দিনেশ চন্দ্র বর্মন। অতিরিক্ত গরমের কারণে হঠাৎ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস জানান, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের শরীরে খুব দ্রুত পানিশূন্যতা দেখা দেয়। ফলে ডায়রিয়া, জ্বর, হিট র্যাশ ও শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি তাদের মধ্যে বেশি। এছাড়া স্কুলগামী শিশু-কিশোররা রোদে দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে ‘হিট স্ট্রোক’-এ আক্রান্ত হতে পারে। একইভাবে বৃদ্ধদেরও বয়সজনিত কারণে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কম থাকায় তারা দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
সিভিল সার্জন আরও বলেন, “ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহের মাত্রা আরও বাড়তে পারে। তাই শুধু চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত বৃক্ষরোপণ ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।” বর্তমানে কুড়িগ্রামের নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ব্র্যাক, হ্যান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনাল এবং এসওএস-এর সহযোগিতায় বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
