• শুক্র. জুন ২৬, ২০২৬

Sakaler Kagoj

The Most Popular News Portal

পান্ডা : কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিমাপের থার্মোমিটার

ডিসে ২৯, ২০২৫
পান্ডা : কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিমাপের থার্মোমিটার

পান্ডা : কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিমাপের থার্মোমিটার

প্রফেসর মীর্জা মো: নাসির উদ্দিন

পান্ডা ভালুকের মতো দেখতে সাদাকালো রঙের স্তন্যপায়ী প্রাণী। পান্ডা একমাত্র দক্ষিণ-পশ্চিম ও পশ্চিম-মধ্য চীনের পাহাড়ি ঢালের ঘন বাঁশবনে বাস করে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের সিচুয়ান, শানসি এবং গানসু প্রদেশের পাহাড়ি বাঁশ বন এদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল। একটি পূর্ণবয়স্ক পান্ডা দিনে প্রায় ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা শুধু খেয়েই কাটায়। তারা প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত বাঁশ খেতে পারে। মজার বিষয় হলো পান্ডার এই খাদ্যাভ্যাস অনুযায়ী তারা মাংসাশী প্রাণীর গোত্রে পড়লেও তাদের খাবারের ৯৯ শতাংশই হলো বাঁশ। চীন বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে পান্ডা অন্য কোন দেশকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লীজ বা উপহার দেয় যা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সংরক্ষণ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। একটি দূর্লভ প্রাণী হিসেবে পান্ডার এ সম্মানজনক অবস্থান বিশ্বব্যাপী পান্ডা কুটনীতি নামে পরিচিত।

পান্ডা কূটনীতি শুধু বন্ধুত্বের প্রতীক এমনটা নয় বরং এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি সূক্ষ্ম মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করে চীন। চীন তাদের ব্যবসায়িক অংশীদারদের পুরস্কৃত করতে বা কোন কারণে তাঁদের সাথে অসন্তোষ দেখা দিলে পান্ডা কূটনীতির দেয়া -নেয়ার সূত্র ব্যবহার করে থাকে। কোনো দেশের সাথে বড় ধরনের বাণিজ্যিক চুক্তি হলে চীন সেখানে পান্ডা পাঠায় যা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে ধরা হয়। আবার রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক মতবিরোধ দেখা দিলে তাঁরা সেই দেশ থেকে পান্ডা ফিরিয়ে আনে।

প্রাচীনকাল থেকেই চীনের শাসকরা অন্য দেশের শাসকদের কাছে বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে পান্ডা উপহার দিয়ে আসছেন। কেননা পান্ডা চীনের অন্যতম জাতীয় প্রতীক যা কেবল চীনের বন্য পরিবেশেই পাওয়া যায়। আধুনিক যুগে পান্ডা কূটনীতি শুরু হয় ১৯৪৯ সাল থেকে। গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৭ সালে তৎকালীন চীনা নেতা মাও সেতুং সোভিয়েত ইউনিয়নকে পিং পিং নামের একটি পান্ডা উপহার দেন। এরপর ১৯৫৯ সাল থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে উত্তর কোরিয়াসহ অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক মিত্রদের কাছেও আরও কিছু পান্ডা পাঠায় চীন।

১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের ঐতিহাসিক চীন সফরের পরে পান্ডা কূটনীতি নিয়ে বিশ্ব জূড়ে আলোচনা শুরু হয়। বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ‘লিং লিং’ এবং ‘হসিং হসিং’ নামে দুটি পান্ডা উপহার দেয়।পরবর্তীতে জাপান, ফ্রান্স, ব্রিটেন, স্পেনসহ অন্যান্য দেশগুলোতেও তার পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পান্ডা উপহার দেয়। ১৯৮৪ সাল থেকে চীন পান্ডা উপহার দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। বর্তমানে শুধু লিজ (loan) দেয় এবং এর জন্য বার্ষিক ফি নেয়। বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর চিড়িয়াখানা গুলোকে ১০ বছরের জন্য পান্ডা লীজ দেওয়ার প্রথা চালু করে এবং পান্ডা গ্রহণ কারী দেশগুলোকে একটি পান্ডার জন্য বছরে প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার অর্থ ফি বাবদ পরিশোধ করতে হয়। এছাড়াও পান্ডার কোন বাচ্চা জন্মালে প্রতিটি বাচ্চার জন্য বছরে ২ লক্ষ ডলার অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করতে হয়। এই অর্থ সরাসরি চীনের পান্ডা সংরক্ষণ এবং প্রজনন কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হয় বলে চীন দাবি করে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৩ সালের একটি জার্নালে বলা হয় চীনের সাথে ইউরেনিয়াম ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক চুক্তি কানাডা, ফ্রান্স এবং অস্ট্রেলিয়া সাথে স্বাক্ষরিত হয় এবং সেসময় চীন তাদেরকে পান্ডা উপহার দেয়। একইভাবে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোর সাথে মুক্ত-বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে পান্ডা কূটনীতি ছিল।

চীন যে সকল দেশ থেকে পান্ডা ফিরিয়ে নিয়েছে:
চীন সাধারণত:
কোন দেশকে ১০ বছরের জন্য পান্ডা লিজ হিসেবে দিয়ে থাকে। তবে লিজ গ্রহণকারী দেশটি ১০ বছর যে পান্ডা রাখবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। সংশ্লিষ্ট দেশের সাথে তাঁদের রাজনৈতিক কিংবা ব্যবসা বাণিজ্য বা অন্য

কোন কারণে সম্পর্ক খারাপ হলে সেক্ষেত্রেও চীন পান্ডা ফেরত নিতে পারে। এমনকি চুক্তির অংশ হিসেবে দেশগুলিতে জন্ম নেওয়া পান্ডা শাবকগুলিকে তাদের চতুর্থ জন্মদিনের আগেই চীনে ফেরত পাঠাতে হবে।

২০১০ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দালাই লামার সাথে সাক্ষাৎ করেন। চীন বিষয়টিকে ভালোভাবে নেয় নি। কেননা চীন তিব্বত দখল করার পর থেকে তিব্বতের বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান ধর্ম গুরু দালাই লামাকে একজন বিপজ্জনক বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে দেখে। দালাই লামার সাথে বারাক ওবামার সাক্ষাতে চীন অসন্তুষ্টু হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাই শান এবং মেই ল্যান নামের দুটি পান্ডাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। ২০১৭ সালে ওয়াশিংটন ডিসির জাতীয় চিড়িয়াখানা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী বাও বাও নামের পান্ডা শিশুকেও চীনে ফেরত নেয়া হয়েছিল।

চীন ২০১৪ সালের এপ্রিলে কুয়ালালামপুর চিড়িয়াখানায় একজোড়া পান্ডা লীজ দেওয়ার জন্য মালয়েশিয়ার সাথে একটি চুক্তি করে। চুক্তির কিছু দিন পর ১৫২ জন চীনা নাগরিক নিয়ে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি বিমান নিখোঁজ হয়ে যায়। চীনের জনসাধারণ মনে করে যে মালয়েশিয়ার সরকার নিখোঁজ বিমান এবং এর যাত্রীদের সন্ধানে যথেষ্ট তৎপরতা দেখায় নি এবং যাত্রীদের সন্ধানে যথাযথ ভূমিকা রাখেনি।। এ ঘটনায় চীন অসন্তুষ্ট হয় এবং মালয়েশিয়ায় পান্ডা পাঠানো বিলম্বিত করে।

১৯৭২ সালে চীনের সাথে জাপান স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার পর বেইজিংয়ের কাছ থেকে প্রথম দেশটিতে পান্ডার আগমন শুরু হয়েছিল। এর পর থেকে ৩০টির বেশি পান্ডা চীন থেকে আনা হয়েছে কিংবা জাপানের চিড়িয়াখানায় এদের জন্ম হয়েছে। চীন অবশ্য পান্ডা পাঠিয়েছিল স্থায়ী উপহার হিসেবে নয় বরং এমন শর্তে যে নির্ধারিত সময়ের পর এদের যেন চীনে ফেরত পাঠানো হয়। একই সঙ্গে এ রকম আরেকটি শর্ত চীন জুড়ে দিয়েছিল যে তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া যুগল পান্ডা শাবক প্রসব করলে সেগুলোর মালিকানাও থাকবে চীনের কাছে। অর্থাৎ চীন চাইলে এদেরও দেশে ফেরত নিয়ে যেতে পারবে।


গত নভেম্বরে প্রথম নারী হিসেবে সানায়ে তাকাইচি জাপানের প্রধানমন্ত্রী হন। জাপানের সংসদের নিম্নকক্ষের একটি কমিটির সভায় প্রশ্নোত্তর পর্বে জাপানের প্রধান মন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন তাইওয়ানে জরুরি অবস্থা দেখা দিলে জাপানকে যুদ্ধের জন্য তৈরি থাকতে হবে। এর পর থেকে চীনের সাথে সম্পর্ক হঠাৎ করেই হোঁচট খায়। সম্পর্কের ধারাবাহিক অবনতির কারণে চীন এখন পান্ডাকে কূটনীতির মঞ্চে নিয়ে এসেছে। তাঁরা জাপানে থাকা সব কটি পান্ডা দেশে ফিরিয়ে নিতে চাইছে।

ফিনল্যান্ড ২০১৮ সালে আনা পান্ডা দুটিকে তাদের নির্ধারিত সময়ের প্রায় আট বছর আগেই চীনের নিকট ফেরত পাঠায়। ফিনল্যান্ড তাঁদের পান্ডা দুটিকে ফিরিয়ে দিয়েছে মূলত অতিরিক্ত খরচ এবং আর্থিক ক্ষতির কারণে যা কোভিড-১৯ মহামারী ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে বেড়ে গিয়েছিল কারণ চিড়িয়াখানাগুলো দর্শনার্থী কমে যাওয়ায় ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছিল। ফলে ফিনল্যান্ডের আহটারি চিড়িয়াখানা পান্ডা ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

পান্ডা নিয়ে কূটনৈতিক ঘটনা অনেক থাকলেও চীনা লোককথা অনুযায়ী পান্ডাদের শরীরের কালো রঙের পেছনে একটি কিংবদন্তি গল্প আছেÑএক সময় পাহাড়ে কয়েকজন মেষপালক শিশু পান্ডাদের সাথে খেলছিল। হঠাৎ একটি হিংস্র চিতা আক্রমণ করলে একটি সাহসী মেয়ে শিশু পান্ডাদের বাঁচাতে গিয়ে মারা যায়। শিশুটির মৃত্যুতে পান্ডারা গভীরভাবে শোকাহত হয়। শোক প্রকাশ করতে তারা মানুষের মতো করে চোখে হাত দিয়ে কাঁদে ফলে চোখের চারপাশ কালো হয়ে যায়। হাত দিয়ে কান ঢাকে তাই কানও কালো হয়। মাটিতে গড়াগড়ি দেয়ায় কাঁধ ও পা কালো হয়ে যায়। চীনারা মনে করে এই শোকের চিহ্ন হিসেবেই পান্ডাদের শরীরে কালো- সাদা রঙ স্থায়ী হয়ে যায়। গল্পের মতোই পান্ডা কূটনীতি নিয়ম মেনে চলে। কারও সাথে সম্পর্ক ভালো থাকলে সেটি সাদা রঙের প্রতীক আর সম্পর্ক খারাপ হলে তা হবে শোকের কালো রঙের প্রতীক।

তবে পান্ডা কূটনীতির একটি বড় সাফল্য এই যে পান্ডা এভাবেই পৃথিবীতে টিকে থাকবে। একটি বিপন্ন প্রজাতির তালিকা থেকে পান্ডা বের হয়ে আসতে পেরেছে। ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী চীনের বন্য পরিবেশে পান্ডার সংখ্যা ১৯০০ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন গবেষণাগার ও চিড়িয়াখানায় ৮০০ পান্ডা সহ মোট পান্ডার সংখ্যা এখন ২৭০০। জায়ান্ট পান্ডা শুধু চীনের জাতীয় প্রাণীই নয় এটি চীনের এক বৈশ্বিক প্রতীক।

লেখক: অধ্যক্ষ, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম।

bitcoin mixer