কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর সাবেক ছিটমহলে অন্যের জমি নিজের নামে রেকর্ড করে দখলের চেষ্টা, বাড়িঘর ভাঙার হুমকি এবং একাধিক ধরণের হয়রানির অভিযোগ উঠেছে উপজেলার পাথরডুবি ইউনিয়নের সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মহিউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে দাবী করেছেন।
সরেজমিনে স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভারতের সেউতিকুর্ষা ছিটমহল বর্তমানে পাথরডুবি গ্রামের মৃত মাজম আলীর ছেলে মহিউদ্দিন আহমেদ বিগত শাসনামলে দলীয় প্রভাব ও মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় ব্যবহার করে ছিটমহলের বিভিন্ন জমির ওপর প্রভাব বিস্তার করেন। ছিটমহল বিনিময়ের সময় জমি দখল ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে নিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র গড়ে তোলেন বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। কেউ প্রতিবাদ করলে মারপিট ও ভয়ভীতি দেখিয়ে চুপ করিয়ে রাখতেন। তার এসব কর্মকাণ্ডে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ থাকলেও কেউই মুখ খুলতে সাহস পাননি। তবে সরকার পরিবর্তনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ছাত্রদের ওপর হামলার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলা হলে এলাকাবাসী প্রকাশ্যে কথা বলতে শুরু করেন।
ভুক্তভোগী ও মামলা সূত্রে জানা গেছে, পাথরডুবি ইউনিয়নের বিলুপ্ত সেউতিকুর্ষা ছিটমহলের মৃত মাহাতাব আলী মাতুর পৈতৃক ও ক্রয়কৃত মোট ৯৩ শতক জমি দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে ছিল। তার মৃত্যুর (২০১৯) পর জমিটি তার ছেলে রজব আলী এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত একমাত্র কন্যা মোছাঃ লাইলী বেগম যৌথভাবে দেখভাল করে আসছেন। ২০১৬ সালে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি বাস্তবায়নের পর রেকর্ড সংশোধনের প্রক্রিয়ায় রজব আলী ও তার বোন কাগজপত্র ও ভূমি অফিসের কাজ পরিচালনায় অভিজ্ঞ না হওয়ায় দায়িত্ব পড়ে তাদের আপন চাচা মহিউদ্দিনের উপর।
জমি রেকর্ড করে দেওয়ার জন্য ৫০ হাজার টাকাও নেন বলে অভিযোগ করেন রজব আলী। পরে সুযোগ কাজে লাগিয়ে গোপনে একই গ্রামের আবুল কালাম, বাবুল হোসেন, মিজানুর রহমান এবং নিজের স্ত্রী ফাতেমা খাতুনের নামে উক্ত জমির আরএস রেকর্ড করে নেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ আছে। পরে রজব আলী খাজনা দিতে গেলে পাথরডুবি ইউনিয়ন উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা তাকে জানান, তার পৈতৃক জমির রেকর্ড মহিউদ্দিনসহ পাঁচজনের নামে হয়েছে।
রজব আলীর দাবি, বিষয়টি জানার পর মহিউদ্দিন রেকর্ড সংশোধন করে দেওয়ার কথা বলে আরও ৩ লাখ টাকা নেন। কিন্তু সংশোধন না করে বরং ওই জমির অংশ নিজের মেয়ে মেহজাবিন আহমেদের নামে কবলামূলে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় গ্রাম্য সালিশ হলেও কোনো সমাধান না হওয়ায় গত ৩ নভেম্বর (২০২৪) ভুক্তভোগী রজব আলী ভুরুঙ্গামারী সহকারী জজ আদালতে মোট আটজনকে বিবাদী করে মামলা (নং: ১৯৭/২৪) করেন। মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, মামলা চলমান থাকা অবস্থায় মহিউদ্দিন ও তার দুই সহযোগী আবুল কালাম ও বাবুল হোসেন আদালতে মিথ্যা তথ্য দিয়ে দাবি করছেন রজব আলীর কোনও বসতবাড়ি নেই, জমিটি নাকি বালুচর। এছাড়া তারা রজব আলী ও তার বোন লাইলী বেগমকে প্রকাশ্যে প্রাণনাশসহ বাড়িঘর ভেঙে দখল নেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। এতে তারা পরিবারসহ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত সাবেক কমান্ডার মহিউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বাড়িতে গিয়ে ও ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস ছবুর জানান, সে সময় জমিয়ে রেকর্ড হয়েছিল দখল যার জমি তার। মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিনের ভাই ভারতে চলে যাওয়ার সুবাদে ভাতিজা ভাতিজিদের না দিয়ে তিনি রেকর্ড করে নেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ বৈঠক হলেও কোন সুরাহা হয় নাই। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা বিচারাধীন আছে।
ভুরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আল হেলাল মাহমুদ বলেন, “এখন পর্যন্ত এরকম কোন অভিযোগ পাইনি। কেউ অভিযোগ দিলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ থাকলে ভুক্তভোগী পরিবারের লিখিত আবেদনও গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই রেকর্ড জালিয়াতি ও প্রভাব খাটিয়ে জমি দখলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা চলছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যে কোনো সময় বড় ধরনের সংঘর্ষ, হত্যাকাণ্ড বা অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটতে পারে। তাই তারা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ ও দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন।
