হুমাযুন কবির সূর্য:
জিলাপী বিক্রির ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাড়া ফেলে দেয়া কুড়িগ্রামের কনটেন্ট ক্রিয়েটর তাইজুল ইসলাম তাজুকে নিয়ে এখন ব্যাপক ক্রেজ তৈরি হয়েছে। মিডিয়ায় তাকে নিয়ে চলছে নানান আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়। প্রতিদিন তার বাড়িতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছে আগ্রহী লোকজন। দেয়া হচ্ছে নানান প্রতিশ্রুতি। এসব প্রতিশ্রুতি ও টানা সাক্ষাৎকার দিতে দিতে ক্লান্ত তাইজুলের এখন দিশেহারা অবস্থা!
তাইজুল এই প্রতিবেদককে জানান, ‘আমি ঠিকমতো খাইতে পারছি না, বিশ্রাম নিতেও পারছি না। প্রতিদিন মিডিয়া ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সাথে সময় দিতে দিন চলে যায়। নিজের কাজ কিছুই করতে পারছি না।’
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের ঢাকডহর সরকার পাড়া গ্রামের বাসিন্দা তাইজুল ইসলাম তাজু(৩২)। বাবার নাম সিরাজ উদ্দিন এবং মায়ের নাম তাহেরা বেগম। তিন ভাই, তিন বোনের মধ্যে তাইজুল সবার বড়। তার দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। ছোট বোন সুফিয়া সামনে এসএসসি পরীক্ষা দিবে। এছাড়াও তার ছোট ভাই মাইদুল ইসলাম কুড়িগ্রাম আলিয়া মাদ্রাসায় ৯ম শ্রেণিতে পড়ে। নিজে লেখাপড়া করার সুযোগ না পেলেও কায়িক পরিশ্রম করে ভাই-বোনদের লেখাপড়া চালিয়ে নিতে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন তাইজুল। বাবা ও মা শ্রবণ প্রতিবন্ধী। দুজনেই অসুস্থ্য ফলে তাইজুলের আয়ে চলছে পুরো সংসার। এখন তার ছোট ভাই মাইদুল ইসলামও মাঝে মধ্যে বাইরে শ্রমের কাজ করে পরিবারকে সহায়তা করছে।
নারায়ণপুর ইউনিয়নটি নাগেশ্বরী উপজেলা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন একটি ইউনিয়ন। এটি একটি দ্বীপ ইউনিয়ন। ব্রহ্মপূত্র, দুধকুমর ও গঙ্গাধর নদী পেরিয়ে নারায়ণপুরে যেতে হয়। নারায়ণপুরের পূর্ব ও উত্তর কোণ ঘেঁষে আছে ভারতীয় সীমানা। শুকনো মৌসুমে ভারতে পায়ে হেঁটে যাওয়া গেলেও জেলার সাথে নৌকা ছাড়া যাতায়াতের কোন বিকল্প পথ নেই। এই ইউনিয়নে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি করে বালক ও বালিকা বিদ্যালয় থাকলেও কোন কলেজ না থাকায় উচ্চ শিক্ষার জন্য বঞ্চিত এই ইউনিয়নের শিক্ষার্থীরা।
প্রতিবছর বন্যা, খরা, নদী ভাঙন ও শৈত্যপ্রবাহের সাথে এখানকার মানুষকে লড়াই করতে হয়। এই লড়াইয়ে অনেকে সর্বস্বান্ত হয়ে যান। অনেকে নদীর নতুন চর, নতুন পলিমাটি পেয়ে নতুন আশায় আবার বুক বাঁধেন।
কৃষি এখানকার মানুষের প্রধান পেশা। কৃষির পাশাপাশি অনেক পরিবার মৎস শিকারের সাথে জড়িত। এছাড়াও সীমান্ত এলাকা হওয়ায় অনেকে অবৈধ চোরাচালানের সাথে জড়িত বলে সন্দেহ করা হয়। এসব নানান প্রতিকূল পরিবেশ, ভোগান্তি ও প্রতিবন্ধকতাই তাইজুলের ভিডিওতে ফুটে এসেছে।
ব্যক্তিগতভাবে তাইজুল একজন রাজমিস্ত্রীর হেলপার। ঢাকা শহরে বিভিন্ন ইমারত নির্মাণ কাজে সে শ্রম বিক্রি করে। বছরে দুইবার দুই থেকে তিন মাস বাইরে কাজ করে যা উপার্জন করে সেই টাকা দিয়ে চলে ভাইবোনদের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ। চরম অভাব ও অনটনের কারণে খুব মানসিক চাপের মধ্যদিয়ে কাটে তাইজুলের দিন। বাড়িভিটা না থাকায় অন্যের জমিতে দুটো টিনের ঘর তুলে সেখানে গাদাগাদি করে থাকতে হয় তাদেরকে।
সংসারে এমন দৈনতা থাকার কারণে এক সময় তার স্ত্রী তাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যায়। প্রায় দুই বছর পূর্বে তার বিয়ে হয়। বিয়ের ৩/৪ মাসের মধ্যে স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যায়। এরপর থেকে ভীষণ একা হয়ে যায় তাইজুল। মনের দু:খ কষ্ট ভুলতে স্থানীয় সাংস্কৃতিক শিল্পীদের সাথে মেলামেশা শুরু করে। এভাবে কিছুটা সময় চলে যায়। পরে টাকা জমিয়ে একটি এনড্রয়েড মোবাইল কিনে ভিডিও করা শুরু করে। গত দেড় বছরে প্রায় ১৪০টি ভিডিও করেছে বলে জানায় তাইজুল।
এ ব্যাপারে এই প্রতিবেদককে তাইজুল বলেন, সংসারে এত কষ্ট এত দু:খ বলার মতো নয়। কাউকে মনের কথা খুলে বলতেও পারি না। এই মনের কষ্ট গোপন রাখার জন্য ভিডিও ধারণ করা শুরু করি। এতে আমাকে সহযোগিতা করেন স্থানীয় কবিরুল ইসলাম সরকার কবির মেম্বার ও ব্যাংক কর্মকর্তা শাহ আলম। অবেলা মিউজিক নামে এদের একটি সাংষ্কৃতিক দল আছে। এরা গান বাজনার সাথে জড়িত। এদের সাথে থাকতে ভালো লাগে। এরাই আমাকে মেবাইল চালাতে ভিডিও করতে এবং পেজ খুলে আপলোড করতে সহযোগিতা করেছে। তাইজুল ইসলামের তাজু ২.০ নামের পেজটিতে ফলোয়ারের সংখ্যা ছিল ৩১ হাজার। এখন যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ লাখে। এছাড়াও তার ইউটিউব খোলার দুদিনের মধ্যে ফলোয়ার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ হাজার।
তাইজুল সম্পর্কে অবেলা মিউজিকের পরিচালক কবিরুল ইসলাম সরকার ওরফে কবির মেম্বার বলেন, আমার জীবনে তাইজুলের মতো সৎ মানুষ আমি আর দেখিনি। তার কাছে লাখ লাখ টাকা জমা রাখলেও সে একটি টাকা এদিক ওদিক করবে না। তার পরিবারে অনেক সমস্যা তারপরেও সততা তার বড় গুণ। আমরা যতটুকু পারি তাকে সহায়তা করার চেষ্টা করি। দুই বছর পূর্বে আবার মোবাইল দিয়ে তাইজুলকে ভিডিও করা শেখাই। সে খুব সাদামাটা ও সহজ সরল ছেলে। তার মধ্যে কোন ভনিতা নেই। কোন অহংকার নেই।
তবে মিডিয়ায় আলোচিত হওয়ার পর থেকেই বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুক্ষিণ হয়েছেন তাইজুল ভাই। এখন তাকে নানান ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা হচ্ছে। অনেক উপঢৌকন নিয়ে এসে রিল করছেন। তাদেরকে কিছুই বলতে পারছেন না তাইজুল ইসলাম। বাধ্য হয়ে তাদের সাথে ভিডিও করছেন।
এদিকে কৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) নাগেশ্বরী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের পক্ষ থেকে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বদরুজ্জামান রিশাদ তাকে নারায়ণপুরে খাস জমি বন্দোবস্ত করে বসতবাড়ি নির্মাণসহ তার পরিবারকে কিছু কৃষি জমিরও বন্দোবস্ত করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন। এসময় তার কাছে নগদ ১০ হাজার টাকা হস্তান্তর করা হয়। বিতরণ অনুষ্ঠানে ‘পথশিশুর’ পক্ষ থেকে কালবৈশাখী ঝড়ে বিধ্বস্থ তাইজুলের ঘর মেরামতের জন্য দুই বান্ডিল টিন ও ৫ হাজার টাকা প্রদান করা হয়।
আলোচিত তাইজুল ইসলাম গত ৩দিনের মধ্যেই অনেকটা পাল্টে গেছেন। এখন তার শরীরে শোভা পাচ্ছে নতুন পোষাক। বিভিন্ন উপঢৌকনে ভাসছেন তিনি। ভিডিওতে চিরচেনা তাইজুল ভাইকে এখন দেখা যাবে নতুন আঙ্গিকে।
তাইজুল ইসলাম জানান, চলতি বছরের ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের পাশে একটি জিলাপির দোকানে গিয়ে ভিডিও করেছিলাম। সেই ভিডিওটা দিয়েই আমি প্রথম ভাইরাল হই।
ভিডিওতে দেখা যায় তিনি বলছেন, ‘অনেক এখানে দোকানপাট, অনেক জিলাপি ভাজতাছে। তার কাছে আমি প্রশ্ন করবো-জিলাপি কত করে বিক্রি করেন? সাদাডা কত, লালডা কত? পরে তিনি দোকানিকে প্রশ্ন করেন, জিলাপি আজকে কত করে বেজতাছেন, সরকারি রেটে? যদি জনগণকে বলতেন তাহলে অনেক খুশি হইতাম।’ এই ভিডিও নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। কেউ ভিডিওটি বিনোদন হিসেবে প্রশংসা করেন, কেউবা ব্যঙ্গ করে মন্তব্য করেন। তবে ভিডিওটি প্রায় ৫ মিলিয়ন মানুষ দেখেন। এখান থেকেই সকলের নজর কাড়েন তাইজুল ভাই।
তাইজুল ইসলাম তাজুকে নিয়ে প্রথম সাক্ষাৎকার নেয়া কুড়িগ্রামের সাংবাদিক হুমায়ুন কবির সূর্য বলেন, আমি অফিস থেকে এ্যাসাইনমেন্ট পেয়ে প্রথম নারায়ণপুরে যাই। ভোর ৬টায় মটর সাইকেলে রওয়ানা দেই। ৪টি নদী পেরিয়ে সকাল সাড়ে ৯টায় সেখানে পৌঁছাই। অনেক কাঠখড় পুরিয়ে ১১টার দিকে তার সাক্ষাৎ পাই। অনেক অনুরোধ করে আধাঘন্টা সময় নেই। তিনি রাজি হলে, আমি তার সাথে অনেক মনযোগ সহকারে কথা বলে তাকে যাচাই করার চেষ্টা করি এবং সেভাবে ইন্টারভিউটা নেয়া শুরু করি। বিশেষ করে সাক্ষাৎকারে এই পেশায় আসার সরল স্বীকারোক্তিতে তাইজুল ভাই যখন বলেন-‘সংসারের অভাব অনটন আর দু:খ কষ্ট ভুলতে ভিডিও ধারণ করি এবং আমি মুখ্যসুখ্য মানুষ আমাকে কেউ সাংবাদিক বলবেন না। আমি সাংবাদিক নই। তার এই দুটি উক্তি চ্যানেলগুলোতে প্রচারের পর তিনি আরও লাইম লাইটে চলে আসেন।
আমি খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করেছি, তাইজুল ভাই একজন সহজ সরল মানুষ। কোন ঘোরপ্যাচ বোঝেন না। গুছিয়ে আপনার মনের মত উত্তর দিতে পারবেন না। কিন্তু তার পেশাগত কাজে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ সৎ ও নির্ভিক। তার ধারণ করা ১৪০টি রিল দেখলে আপনার অবশ্যই মনে হবে তিনি একজন সমাজ সচেতন ব্যক্তি। বিচ্ছিন্ন একটি এলাকায় অবস্থান করে সেই এলাকার দু:খ দুর্দশা যেভাবে ভিডিওর মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন যা না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। তিনি কখনোই নিজের কথা বা পরিবারের কথা বলেন নি। এখানেই তাইজুল ভাইয়ের স্বাতন্ত্রতা লক্ষ্য করা যায়। তবে মিডিয়ার লোকজন ও কনটেন্ট ক্রিয়েটররা যেভাবে তাইজুল ইসলামকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমন করছেন তার গোপনীয়তা উন্মুখ করছেন এটা মোটেই ভাল কাজ নয়। তাইজুল ভাইকে তার মতোই থাকতে দেয়া দরকার। না হলে প্রকৃত তাইজুল ইসলামকে আমরা এক সময় হারিয়ে ফেলবো।’
