ডেস্ক নিউজ:
দেশে নদী ভাঙনপ্রবণ জেলাগুলোর মধ্যে কুড়িগ্রামও একটি। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ভাঙন দেখা দেয় জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদ-নদীর তীরে। বর্ষা মৌসুম শেষ হলেও নতুন করে আরো ১৫টি পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙনের কবলে পড়ে অনেকেই ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন। এ বছর বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙনে বসতঘর হারিয়েছে অন্তত পাঁচ শতাধিক পরিবার। এ অবস্থা চলতে থাকলেও ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
অবশ্য পাউবো কর্তৃপক্ষ বলছে, ভাঙনকবলিত নয়টি পয়েন্টে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। বরাদ্দ পেলে বাকি পয়েন্টগুলোতেও কাজ করা হবে।
জেলার সাড়ে চার শতাধিক চরে প্রতি বছর গড়ে দুই হাজার পরিবার নদীভাঙনে তাদের বসতি হারায়। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য বলছে, ২০১৬-২২ সাল পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার নদের ভাঙনে ১৫ হাজার পরিবার তাদের বসতবাড়ি হারিয়েছে। এ বছর ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে সদর, উলিপুর, চিলমারী ও রাজিবপুর উপজেলায় ৪৪৭টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এছাড়া রৌমারী উপজেলার সোনাপুরে শতাধিক পরিবার, রাজারহাটে তিস্তার ভাঙনে ৬৩টি এবং ফুলবাড়ী রউপজেলায় ধরলা নদীর ভাঙনে ছয়টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। এসব পরিবার অন্যের জমিতে ও বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় অনেকেই পরিবার নিয়ে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছেন।
নদ-নদী তীরের বাসিন্দারা বলছেন, বর্ষার শেষ সময়ে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে ঘরবাড়ি, আবাদি জমিসহ গাছপালা। দুই সপ্তাহ আগে টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে জেলার নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে ওঠানামা করে। পরে ধীরগতিতে কমতে থাকে দুধকুমার, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার পানি। এতে তীব্র হয়ে উঠেছে ভাঙন। গত এক সপ্তাহে এসব নদ-নদীর ভাঙনে সদর উপজেলার বানিয়াপাড়া, নাগেশ্বরীর বল্লভের খাস, রৌমারীর সোনাপুরসহ ফুলবাড়ি ও চিলমারী উপজেলায় অন্তত ১৫টি পয়েন্টে নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে নতুন করে বসতঘর হারিয়েছে অন্তত ২০টি পরিবার। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে শত শত ঘরবাড়ি, আবাদি জমি, হাটবাজারসহ বিভিন্ন স্থাপনা।
সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের বানিয়াপাড়ার বাসিন্দা আমজাদ হোসেন জানান, নদীর কিনারে তার বাড়িটি পড়েছে। ভাঙনও অব্যাহত রয়েছে। বাড়ির অর্ধেক সরিয়ে নিয়েছেন। বাকি অর্ধেকও সরিয়ে নিতে হবে।
নাগেশ্বরী উপজেলার বল্লভের খাস ইউনিয়নের বাসিন্দা লেবু মিয়া জানান, দুধকুমার নদের ভাঙনে শত শত বিঘা আবাদি জমি বিলীন হয়েছে। ঘরবাড়িও হারাতে হয়েছে অনেককে। বারবার পানি উন্নয়ন বোর্ডে যোগাযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। ভাঙন এখনো অব্যাহত রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ বছর বর্ষা মৌসুমে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, দুধকুমার নদের ৩৩ পয়েন্টে ভাঙন দেখা দেয়। গত দুই মাসে কুড়িগ্রাম সদর, নাগেশ্বর, রৌমারী, উলিপুর, রাজারহাটের শতাধিক ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। অনেকে অন্যের জমি, বাঁধ ও আশ্রয় কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছে।
ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের চর গোরকমণ্ডপ এলাকার ধরলা নদীর ভাঙনের শিকার নুরনবী বলেন, ‘গত এক মাসে গ্রামের প্রায় ১৫টি ঘরবাড়ি ও আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আমরা কোথায় যাব, কী করব জানি না।’
একই এলাকার সালেকা বেগম (৫৫) জানান, চোখের সামনে বাবা-মায়ের কবর ধরলা নদীতে বিলীন হয়ে গেল। কিছুই করতে পারলাম না। যেভাবে নদী ভাঙছে সরকার ব্যবস্থা না নিলে আগামীতে গ্রামে আর থাকা যাবে না।
সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর জানান, ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে বানিয়াপাড়া, সবুজপাড়ার শতাধিক ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে।
রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবুল কালাম আজাদ জানান, দাড়িয়ারপার গ্রামে তিস্তার ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষ কয়েকবার ঠিকানা বদল করেছে।
কুড়িগ্রাম জেলা চর উন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন, ‘উজান থেকে পলি ও বালি এসে নদীতে ডুবোচরের সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে উজান থেকে পানি এসে ডুবোচরে আঘাত করে গতি পরিবর্তন করায় নদীর ভাঙন তীব্র হচ্ছে। ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ডুবোচরগুলো অপসরণ করা না হলে ভাঙন অব্যাহত থাকবে।’
সার্বিক বিষয়ে কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, ‘বর্ষার শেষ সময়ে বৃষ্টি ও উজানের ঢলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি ও হ্রাসের ফলে নতুন করে ১৫টি পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে ভাঙনকবলিত নয়টি পয়েন্টে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। বরাদ্দ পেলে বাকি পয়েন্টগুলোতেও কাজ করা হবে। এর আগে ভাঙনকবলিত ৪৫টি পয়েন্টে কাজ করা হয়েছে।’
