• সোম. অক্টো ১৮, ২০২১

কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে স্নিগ্ধিতা ছড়াচ্ছে কাশফুল

সেপ্টে ২৫, ২০২১

নাজমুল হোসেন:
কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায়,‘কাশফুল মনে সাদা শিহরণ জাগায়, মন বলে কত সুন্দর প্রকৃতি, স্রষ্টার কি অপার সৃষ্টি।’ কবি জীবনানন্দ দাশ শরৎ বন্দনায় লিখেছেন,‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’। কবি জসীম উদদীন ‘বিরহী নারী’ মননে কবিতায় লিখেছেন-‘গণিতে গণিতে শ্রাবণ কাটিল, আসিল ভাদ্র মাস,বিরহী নারীর নয়নের জলে ভিজিল বুকের বাস’। এমন শতশত উক্তি রয়েছে বাংলার সৌন্দর্য্য বাড়িয়ে দেয়া কাশফুল নিয়ে। কারো জন্য কাশফুল মনের মুগদ্ধতা বাড়ায় আবার কারো জন্য অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বাড়ায়।
প্রকৃতিতে যখন শরৎ কাল আসে তখন কাশফুলই জানিয়ে দেয় আগমনী বার্তা। কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল গুলোতে প্রকৃতিতে কাশফুলের রাজত্ব দেখে যে কারোই চোখ-মন জুড়িয়ে আসবে।
কাশফুলের সৌন্দর্য্য দেখতে প্রতিদিন প্রকৃতি প্রেমীদের পদ চারণে মুখরিত জেলার চরাঞ্চল গুলো। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য্য আরও বাড়িয়েছে চরাঞ্চলের বড় বড় ঝাউ গাছ গুলো। এসব ঝাউ গাছে লাল, গোলাপি, হলুদসহ বিভিন্ন রংয়ের ফুল ধরা বাড়তি আকর্ষণ বাড়িয়েছে অবহেলিত চরাঞ্চল গুলোতে। কাশফুলের বাতাসে দোল খাওয়ার দৃশ্য যেন মন কাড়বে সবার। প্রতিবছর শরতের এই সময়টাতে চরাঞ্চলে শহরের মানুষের পদাচারণ পড়ে।
শরতের শেষ বিকেল। থেমে থেমে বৃষ্টি। কালো মেঘের আবরণ ভেদ করে উঁকি দিচ্ছে মিষ্টি রোদ। সাদা মেঘের মিটিমিটি হাসি যেন শুভ্রতা ছড়াচ্ছে চারদিকে। ফুটেছে রঙিন শিউলি। সাদা কাশফুল শারদ বন্দনার কলরবে মেতে উঠেছে। শরত শোভায় প্রকৃতিতে সাজ-সাজ রব। নীল আকাশে চলছে সাদা-কালো মেঘের লুকোচুরি। কখনো কালো মেঘে আবার কখনো সাদা মেঘের আভরণে লুকিয়ে হাসছে সোনালী সূর্য।
পরন্ত বিকেলে মুহুর্তের দৃশ্য অন্য রকম। কেউবা স্ব-পরিবারে ঘুরতে আসেন আবার কেউ প্রিয়জনের সাথে এসেছেন সোনালী শরতের মিষ্টি গন্ধের স্বাদ নিতে।
কাশফুলের আদি নিবাস রোমানিয়ায়। কাশফুল মূলত ছন গোত্রীয় এক ধরনের ঘাস। ঘাস জাতীয় উদ্ভিদটি উচ্চতায় সাধারণত ৭-৮ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। গাছটির চিরল পাতার দুই পাশ বেশ ধারালো। কাশবন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করে না এর রয়েছে নানা ঔষধি গুণও। নদীর ধার, জলাভূমি, চরাঞ্চল, শুকনো এলাকা, পাহাড় কিংবা গ্রামের উঁচু স্থানে কাশের ঝাড় বেড়ে ওঠে। তবে নদীর তীরেই কাশফুল বেশি জন্মাতে দেখা যায়। গ্রাম বাংলার অপরূপ শোভা কাশবন ছিল চিরচেনা দৃশ্য হলেও এই কাশবন এখন আগের মতো চোখে পড়ে না।
চরের মধ্যে সাদা ফুলের সমারোহ দেখতে আসা কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী আহসান রাফি বলেন, মন খারাপ থাকলে এখানে আসি। কিছুক্ষণ সময় কাটাই। মন ভালো হয়ে যায়। তবে নৌকা যোগে আসতে হয়। এজন্য সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হয়।
আরেক শিক্ষার্থী হেনা বলেন, কাশফুল সত্যি প্রকৃতির সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করেছে। শহরের এমন দৃশ্য চোখে পড়েনা। আমাদের গ্রাম বাংলার অনেক ফুল হারিয়ে গেছে। তবে এখন নদী তীরবর্তি চরে কাশবন দেখে আসলেই মনটা ভালো হয়ে যায়।
উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের মোল্লারহাট চরের বাসিন্দা পাখি আক্তার বলেন, চরের মধ্যে কাশফুল আর ওলা (ঝাউ) গাছের বহু রংয়ের ফুল দেখতে অনেক মানুষ আসে। এই কাশিয়া দিয়ে আমরা ঘরের বেড়া, ছাউনি, ঝাড়ু বানাই। আর ওলা গাছ কেটে খড়ির কাজে ব্যবহার করি এবং সেগুলো বিক্রি করে বাড়তি আয় সংসারের কাজে লাগানো হয়।
একই এলাকার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, চরের মধ্যে এই কাশিয়া অনেক কাজে লাগে। বন্যার সময় নদীর স্রোত কমায়। কাশিয়া গরুকে খাওয়ানো যায়। এছাড়াও পানের বরজের জন্য এই কাশিয়া রাজশাহী,খুলনা,বরিশাল সহ দেশের অনেক জায়গায় নৌকা যোগে।
একই এলাকার বাসিন্দা মজিবর রহমান বলেন,চরের পরিত্যক্ত বালু জমিতে একাই হয় কাশিয়া। এর জন্য কোন টাকা- পয়সা খরচ করে আবাদ করা লাগে না। কাশিয়া ৭-৮ফুট লম্বা হয়। এর ফুল আড়াই থেকে ৩ফুট ফুল হয়। বছরে একবারই কাশিয়া হয়।কার্তিক মাসে এই কাশিয়া কাটা হয়। এক বিঘা জমিতে প্রায় পনের শ থেকে দু’ হাজার কাশিয়ার আটি হয়। কাশিয়ার কেটে ১৪ইঞ্চি করে আটি বেঁধে ১০/১২টাকা করে বিক্রি হয়। গড়ে প্রতি বিঘা জমি থেকে কাশিয়া থেকে ১০/১২হাজার টাকা আসে। কার্তিক মাসে চরের অভাব দেখা দেয়। কাশিয়া বিক্রি করে যে টাকা আসে তাতে কার্তিক মাসের অভাব পার হয়ে যায়।
এই বিষয়ে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর মির্জা নাসির উদ্দিন বলেন, কাশফুল প্রকৃতির সৌন্দর্য্য বাড়িয়ে দেয়। এসব কাশবন দেখতে জেলার চরাঞ্চল গুলোতে মানুষের ভীড় জমে। কাশফুল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য্য বাড়ায় না ঔষধি গুণও রয়েছে। মানুষের পিত্তথলিতে পাথর, শরীরে কোথায় ফোঁড়ার সৃষ্টি হলে তার ব্যথা উপশমে হলে কাশফুলের মূল ব্রবহৃত হয়ে থাকে। কাশ আমাদের পরিচিত উদ্ভিদ হলেও এর আদিনীবাস রোমানিয়ায়। এর ইংরেজি নাম ক্যাটকিন এবং বৈজ্ঞানিক নাম হলো স্যাকরারাম এসপোটেনিয়াম।