• বৃহঃ. অক্টো ২৯, ২০২০

নারী নির্যাতন অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া জরুরি

সেপ্টে ১৪, ২০২০

নারীর অবমাননা বা নির্যাতন পরিবার ও সমাজে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। যৌতুকের জন্য, ফতোয়ার শিকার হয়ে, স্বামীর পরকীয়ার কারণে, ধর্ষণ কিংবা গণধর্ষণের শিকার হয়ে, শ্বশুর-শাশুড়ি-দেবর-ননদের অত্যাচার-নির্যাতনে এ দেশের অনেক অসহায় নারীর প্রাণ চলে গেছে, এখনো যাচ্ছে। কেউ কেউ চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে, সন্তানসহ গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মাহুতি দিয়েছে। নারী নির্যাতন রোধে নারী সংগঠন, নারীবাদীরা এমনকি সরকারও সোচ্চার। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, বরগুনার তালতলীতে দুই লাখ টাকা যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী মার্জিয়ার (৩০) শরীরে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা ও চুল কেটে দিয়েছে স্বামী মানিক খান। শুক্রবার দুপুরে তাকে উদ্ধার করে আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপেস্নক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে যৌতুকের টাকা নিয়ে বাকবিতন্ডার একপর্যায়ে স্ত্রীর গায়ে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়ে মাথার চুল কেটে দেয় স্বামী, শাশুড়ি ও ননদ। এর চেয়ে নিষ্ঠুর ঘটনা আর কী হতে পারে। এই ধরনের অমানবিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া জরুরি।
বাংলাদেশে নারীর ওপর নির্যাতন ও সহিংসতার মূলে রয়েছে মনস্তত্ত্ব্ব, পিতৃতন্ত্র ও বৈষম্যমূলক আইন। ইতিহাস, দর্শন, শিক্ষা কারিকুলাম নারীর প্রতিকূলে। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নও নারীর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। রাষ্ট্র আপসহীন না হলে এবং নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ না করলে সমাজের ভেতরে এই অবক্ষয় রুখে দাঁড়ানো যাবে না। পরিবারের দায়িত্ব নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা। আমরা চাই, নারী-পুরুষের সৌহার্দ্যপূর্ণ সমঝোতামূলক সম্পর্ক, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সম্পর্ক। কিন্তু আমাদের এ চাওয়ার সফল বাস্তবায়ন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে কোথাও চোখে পড়ছে না। বরং প্রতিনিয়ত উল্টো ও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটছে।
সংবিধান নারী-পুরুষকে সমান অধিকার দিলেও অশিক্ষা, দারিদ্র্য বাংলাদেশের নারীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা। এ দেশের নির্যাতন সহিংসতার শিকার একটি মেয়েকে থানার পুলিশ থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে সংকট মোকাবিলা করতে হয়। পদে পদে সবাই বোঝানোর চেষ্টা করে যেন মেয়েটাই দায়ী। পরিস্থিতি যদি এমন হয়, তা হলে পরিবার সমাজ থেকে নারী নির্যাতন অবমাননা কীভাবে কমবে? কোনো মানুষ শিক্ষিত নয়, কিন্তু মানবিক ও বিবেক-বিবেচনা বোধ তার মধ্যে রয়েছে, যুক্তির মানেও বোঝে। মানুষের দুঃখ শোকে কাতর হন যিনি, সহমর্মিতা যার মধ্যে জাগ্রত হয় তিনি তো নারী অবমাননাকারী নির্যাতক বা হত্যাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারেন না। বিবেকবোধ ও মানবিকতা সব নারী-পুরুষের মধ্যে জাগ্রত হলে নির্যাতন হত্যা কেন্দ্রিক পারিবারিক ও সামাজিক চিত্র পাল্টে যাবে। তবে তার আগে প্রয়োজন দেশব্যাপী শিক্ষার বিস্তার ঘটানো, দারিদ্র্য বিমোচনে ও বেকারত্ব দূরীকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। সামাজিক সচেতনা বৃদ্ধিসহ পুরুষের মানসিকতার পরিবর্তন এবং নারী অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করলে কিছুটা পরিবর্তন সূচিত হতে পারে, সে জন্য আমাদের নারীদের আরও দীর্ঘ পিচ্ছিল ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিতে হবে।