• বৃহঃ. অক্টো ২২, ২০২০

করোনা দুর্যোগেও নানা কৌশলে দেশে ঢুকছে মাদকের চালান

সেপ্টে ১৪, ২০২০

সরকারের কঠোর অবস্থানেও মাদক চোরাচালানীরা সক্রিয়তায় ভাটা পড়ছে না। করোনাকালে রাজধানীসহ সারা দেশে অপরাধ কমলেও হঠাৎ মাদকের চোরাকারবার বেড়ে গেছে। করোনা দুর্যোগকালেও মাদক কারবারিরা নিত্যনতুন কৌশলে মাদকের চালান নিয়ে আসছে। সীমান্ত এলাকা থেকে কখনো ত্রাণবাহী কিংবা জরুরি পণ্যবাহী যানে; মাছ ধরার ট্রলার, কাভার্ড ভ্যান, কখনো পায়ুপথে, কখনো যানবাহনের ইঞ্জিনের কাভারে করে গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে গাঁজা, ফেনসিডিল কিংবা ইয়াবা। কারবারীরা করোনার মধ্যে মাদকসেবীদের জন্য হোম ডেলিভারিও চালু রেখেছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও ইয়াবা, ফেনসিডিলের চালান ধরা পড়ছে। মূলত দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো দিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে প্রতিদিনই মাদকের চালান আসছে। আর নৌ ও সড়কপথে ওসব মাদক সারা দেশের গ্রাম পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। তবে নৌপথে বেশি মাদক যাচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে মাদকের চোরাচালান বেড়ে গেছে। দেশের ৩২টি জেলার ৪২টি পয়েন্ট দিয়ে বেশি আসছে ফেনসিডিল। টেকনাফের ৩০টি পয়েন্ট দিয়ে ঢুকছে ইয়াবা। তবে চারটি পয়েন্টে ইয়াবা পাচার খুবই জমজমাট। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির কর্মকর্তার সহায়তায় ওসব মাদক সারা দেশে দেদার বিক্রি হচ্ছে।
সূত্র জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, দিনাজপুর, রাজশাহী, যশোর ও সাতক্ষীরা দিয়ে দেশে বেশি আসছে ফেনসিডিল। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ইতিমধ্যে বগুড়ায় মাদকের বড় চালান ধরেছে। তাছাড়া কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্ত দিয়েও গাঁজা ও ফেনসিডিল বেশি আসছে। আর পার্বত্য অঞ্চলের ২৫ কিলোমিটার অরক্ষিত। ওই পথ দিয়েও অস্ত্র ও মাদক আসছে। বিশেষ করে টেকনাফের চারটি পয়েন্ট দিয়ে বেশি আসছে ইয়াবা। টেকনাফ সীমান্তবর্তী নাফ নদীর ওপারে হলো ইয়াবার কারখানা। দুই দেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পর্যায়ে একাধিকার বৈঠক হলেও ওসব কারখানা বন্ধ হয়নি। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। টেকনাফ থেকে ওসব ইয়াবা নৌপথে বরিশাল, পিরোজপুর হয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ও মোংলা-খুলনায় চলে যাচ্ছে। তাছাড়া প্রতিবেশী আরেকটি দেশের সীমান্তে রয়েছে ফেনসিডিলের কারখানা। মাঝখানে সেগুলো বন্ধ ছিল। কিন্তু ডিমান্ড বেশি হওয়ায় এখন সেগুলো আবার চালু হয়েছে। কিন্তু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ওসব কারখানা চালু হয়েছে কিনা জানে বলে জানিয়েছে। তবে সীমান্তে ফেনসিডিল পাওয়া যাচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, বর্তমানে দেশের প্রতিটি গ্রামে মাদক পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির কর্মকর্তা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। নইলে প্রতিটি ওয়ার্ড ও গ্রামে মাদক পাওয়া সম্ভব হতো না। তাছাড়া স্থানীয় একশ্রেণির রাজনৈতিক নেতাকর্মীও প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। আর তা থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একশ্রেণির সদস্য মোটা অঙ্কের টাকা মাসে উৎকাচ পায়। তাছাড়া নৌপথে মাদকের বড় বড় চালান আসলেও শতকরা ২ ভাগও ধরা পড়ছে না। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সোর্সই মাদকের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহায়তা করে থাকে। কিন্তু সোর্সদের কোনো টাকা দেয়া হয় না। বরং প্রচলিত আছে ১ হাজার বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার হলে সোর্সকে দিতে হয় ৩০০ বোতল। পরবর্তী সময়ে সোর্সরা ওসব মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেয়। অথচ সোর্সমানি হিসেবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। আর ওসব টাকার কোনো হিসাবও দেয়া হয় না।
এদিকে এখনো করোনা মহামারীর মধ্যেই হঠাৎ করে মাদকের চোরাচালান বেড়ে যাওয়ার কারণ জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে পুলিশ, র‌্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সব বাহিনীর করোনা ভাইরাস সুরক্ষা কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকার সুযোগ নিচ্ছে মাদক কারবারি চক্রগুলো। তল্লাশি ও নজরদারিতে কিছুটা শিথিলতা তৈরি হওয়ায় তারা বিভিন্ন কৌশলে দেশে মাদকের চালান আনছে। ওষুধ কেনাসহ বিভিন্ন অজুহাতে সরাসরি গিয়ে এবং কুরিয়ার সার্ভিসে পাঠানো পার্সেলের মাধ্যমেও মাদক বিক্রি হচ্ছে। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ থেকে দুটি চালান জব্দ করা হয়। একটি চালান পাঠানো হয়েছিল মুরগির গাড়িতে। আরেকটি চালান ছিল কাভার্ড ভ্যানে। লবণবোঝাই ওই কাভার্ড ভ্যান থেকে ৫৯ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়।
এদিকে এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন) মাসুম রাব্বানী জানান, করোনার কারণে মাদকবিরোধী অভিযান কিছুটা ধীরগতিতে চললেও এখন আবার সারা দেশে অভিযান জোরালো করা হয়েছে। আর এ অভিযান চলবে।
অন্যদিকে একই প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আহসানুল জব্বার জানান, কোস্টগার্ড, বিজিবিসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে সারা দেশে মাদকবিরোধী অভিযান ইতিমধ্যে জোরদার করা হয়েছে। সম্প্রতি বিপুলসংখ্যক মাদক উদ্ধার হয়েছে। আর মাদক নির্মূল করতে যা যা দরকার, সবই করা হবে।