• শুক্র. জুলা ১, ২০২২

মহাসড়কগুলোতে বেপরোয়া ডাকাত ও ছিনতাইকারী চক্র

জুন ১৫, ২০২২

দেশের সড়ক-মহাসড়কের পরিবহনে চাঁদাবাজি ও ডাকাতির ঘটনা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। কৃত্রিম যানজটের পাশাপাশি বিশৃঙ্খলা কিংবা দুর্ঘটনার কারণে সৃষ্ট যানজট ও ধীরগতির গাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরের চার মাসে সারাদেশের সড়ক-মহাসড়কে বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন যানবাহনে ডাকাতির ঘটনায় জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ সাহায্য চেয়ে ৩৪৪টি ফোন আসে। দৈনিক প্রায় ৩টি কলের ঘটনা ঘটছে। তবে বাস্তবে যানবাহনে ডাকাতির সংখ্যা আরো অনেক বেশি। জাতীয় জরুরি সেবা বিভাগের দাবি- ডাকাতির শিকার ব্যক্তিরা তাৎক্ষণিক সাহায্য চেয়ে জাতীয় ৯৯৯-এ ফোন করেছে। দেশের মহাসড়কগুলো বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ফরিদপুর-ঝিনাইদহ সড়ক-মহাসড়কে চলাচলকারী পরিবহনগুলোর যাত্রীরা নিরাপত্তাহীন। পরিবহন খাত এবং জাতীয় জরুরি সেবা বিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, মহাসড়কে হাইওয়ে কিংবা থানা পুলিশের তেমন কোন নজরদারি নেই। যানজটেও পুলিশের টহল দলের দেখা মেলে না। এমনকি ফাঁকা সড়কেও পুলিশী তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। বিশেষ করে রাত গভীর হলেই মহাসড়ক অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। মহাসড়কে শুধু ডাকাত-ছিনতাই চক্রই নয়, পুলিশের বিরুদ্ধেও হরহামেশা চালকদের হয়রানি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠছে। এমনকি সড়ক-মহাসড়কের পাশে টেবিল বসিয়ে নিজেদের তৈরি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে তৈরি করা ভুয়া রসিদ দিয়ে চাঁদাবাজি করে বেড়াচ্ছে সন্ত্রাসীরা। সাম্প্রতিককালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রায় পুরো অংশই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিণত হয়েছে। পণ্যবাহী ট্রাক, লরি ও কাভার্ডভ্যান ছাড়াও প্রাইভেট কার-মাইক্রোবাসে সবচেয়ে বেশি ডাকাতি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই নির্বিঘেœ ডাকাতি করতে অপরাধীরা পুলিশের নকল পোশাকও ব্যবহার করছে। ওসব ঘটনায় মালামাল খোয়ানোর পাশাপাশি ডাকাতদের আক্রমণে প্রায়ই হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। এমন অবস্থায় প্রাণ হাতে নিয়েই মহাসড়কে চলাচল করছে চালক-যাত্রীরা। অথচ মহাসড়কের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খখলার জন্য হাইওয়ে পুলিশ ইউনিট গঠন করা হলেও কার্যত মহাসড়কে অপরাধপ্রবণতা যেন থামছেই না।
সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে যানবাহনে ডাকাতির ঘটনায় জাতীয় জরুরি সেবা বিভাগের প্রাপ্ত কলের সংখ্যা ৯৬টি, ফেব্রুয়ারিতে ৭৭, মার্চে ৭৫ এবং এপ্রিলে ৯৬টি। প্রথম চার মাসের ওই হিসাবে দৈনিক প্রায় তিনটি কলের ঘটনা ঘটছে। তবে বাস্তবে যানবাহনে ডাকাতির সংখ্যা আরও অনেক বেশি। কারণ অধিকাংশ ঘটনায় সরাসরি থানা পুলিশের কাছে যাওয়া কিংবা কেউ কেউ অভিযোগই না করার কারণে ৯৯৯-এ আসা ফোন কলের চেয়ে বাস্তবে ওই সংখ্যা আরো অনেক বেশি। তাছাড়া ২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডাকাতের কবলে পড়ে পুলিশের তাৎক্ষণিক সহায়তা চাওয়া ফোনের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৩৩টি।
সূত্র আরো জানায়, সড়ক-মহাসড়কের ৩০-৩৫টি জায়গায় প্রায়ই ডাকাতি হচ্ছে। তার মধ্যে রয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছাড়াও ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-ফরিদপুর-ঝিনাইদহ মহাসড়ক। বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ, সোনারগাঁ, কাঁচপুর, কুমিল্লার চান্দিনা, পদুয়ারবাজার, বাড়বুকু-, সুয়াগাজী, সীতাকু- এলাকায় ডাকাত চক্রের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের আড়াইহাজার, রূপগঞ্জ, নরসিংদী, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের রাজেন্দ্রপুর (ন্যাশনাল পার্ক), ভালুকা এবং আশুলিয়া, এলেঙ্গা, চম্পাগঞ্জ, মির্জাপুর, কালিয়াকৈর, কবিরপুর, বাইপাইল, নবীনগর, সাভার, হেমায়েতপুর, চন্দ্রা, কোনাবাড়ী, ধামরাই ও কামালপুরসহ আরো কিছু স্থানে ডাকাত-ছিনতাইকারীরা তৎপর। ওসব রুটে সাধারণত বিভিন্ন পণ্যবাহী লরি ও পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের কাভার্ডভ্যান এবং গরুর গাড়িগুলোকে বেশি টার্গেট করা হয়। তাছাড়াও প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, এমনকি যাত্রীবাহী বাসকেও অনেক সময় টার্গেট করে ডাকাত চক্রের সদস্যরা। 
র‌্যাব সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের মারদায়াদী বাজার এলাকা থেকে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে ডাকাত চক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-১১। তাছাড়াও আন্তঃজেলা ডাকাত দলের র্দুর্ধষ আরেক চক্রের কয়েক সদস্যও বর্তমানে গোয়েন্দাদের নজরদারিতে রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের র‌্যাব-১১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেঃ কর্নেল তানভীর মোহাম্মদ পাশা বলেছেন, ঈদের আগে ও পরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বেশ কয়েকটি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ওসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে র‌্যাব মাঠে কাজ করতে গিয়ে দেখেছে, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁকেন্দ্রিক একটি ডাকাত চক্র বেশ তৎপরতা চালিয়ে থাকে। ওই চক্রটি আড়াইহাজার এলাকার দিকেও ডাকাতি করে থাকে। কুমিল্লার চান্দিনা এলাকায়ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে র্দুর্ধষ ডাকাত চক্রের তৎপরতার খবর রয়েছে। ওই চক্রের সদস্যরা সাধারণত আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে না। অস্ত্র হিসেবে তারা ধারাল চাপাতি, কিরিচ, ছোরা ও রামদা ব্যবহার করে থাকে। মহাসড়কে কোন কারণে কোন গাড়ি থামলে বা যানজটে পড়লে সে সুযোগ কাজে লাগায় চক্রটি। তাছাড়া গাছের ডালপালা ফেলে বা গাড়ির কাচে ইট-পাথর নিক্ষেপ করেও গতিরোধের চেষ্টা করা হয়
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে হাইওয়ে পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, সড়ক-মহাসড়কে টহল হাইওয়ে পুলিশের রুটিন ওয়ার্ক। ইতোমধ্যে ডাকাতির ঘটনা একেবারেই ঘটছে না এমন নয়। কিছুকিছু যানবাহন যেমন লোকাল বাসগুলোতেই ডাকাতির ঘটনা বেশি ঘটে। বাসগুলোতে যাত্রীর ছদ্মবেশে উঠে এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে ডাকাত কিংবা ছিনতাইকারী চক্র। সড়ক-মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনা আগেও ছিল, গ্রেফতারও হতো। এখন আবার তাদের উৎপাত দেখা দিয়েছে। শুধু কুমিল্লা নয়, চট্টগ্রাম, মিরসরাই এলাকাতেও হয়। তাদের ডাকাতও বলা যায় না, এরা মূলত মৌসুমি ছিঁচকে ছিনতাইকারী। তাদের গ্রেফতার করা হলেও কিছুদিন পর জামিনে বের হয়ে যায়। মহাসড়কে ওসব ছিঁচকে ছিনতাইকারীকে প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই। সাম্প্রতিককালে ওসব ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় টহল জোরদার করা হয়েছে।