• অক্টোবর ১, ২০২২ ১০:১৮ অপরাহ্ণ

কুড়িগ্রামে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসে অনেক নাটকীয়তার পরে আটক : চার বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত

সেপ্টে ২১, ২০২২

বিশেষ প্রতিবেদক:

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় চলতি এসএসসি পরীক্ষার ইংরেজি ১ম এবং ২য় পত্রের প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। সেই সাথে দিনাজপুর শিক্ষাবোর্ড গণিত, পদার্থ, কৃষি এবং রসায়ন বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যম কর্মীদের নজরে আসলে নড়েচড়ে বসে স্থানীয় প্রশাসন। অনেক নাটকীয়তার পরে মঙ্গলবার মধ্যরাতে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভূরুঙ্গামারী থানায় এ ব্যাপারে ৪জন শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১০/১২ জনকে আসামী করে মামলা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ভূরুঙ্গামারী থানার অফিসার ইনচার্জ আলমগীর হোসেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অন্যতম সহযোগী মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে আসামী না করায় এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা শিক্ষা অফিসার শামছুল আলম বলেন, দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য গণিত, পদার্থ, কৃষি এবং রসায়ন বিষয়ের পরীক্ষার প্রশ্ন যত্রতত্র পাওয়া যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে এই চারটি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
জানা গেছে, থানায় প্রশ্ন বাছাইয়ের (সর্টিং) সময় ভূরুঙ্গামারী নেহাল উদ্দিন পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও ঐ কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিব লুৎফর রহমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপজেলা মাধ্যমিক অফিসার আব্দুর রহমানের যোগসাজসে বাংলা ১ম পত্রের প্রশ্নপত্রের প্যাকেটের ভিতর বাংলা ২য় পত্র, ইংরেজি ১ম ও ২য় পত্রের প্রশ্নপত্রের একটি করে খাম ঢুকিয়ে নেন এবং প্যাকেট সীলগালা করে তার ওপর স্বাক্ষর করেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহমান। বাংলা ১ম পত্রের পরীক্ষার দিন যথানিয়মে থানা থেকে বাংলা ১ম পত্রের প্যাকেট এনে তা খুলে বাংলা ২য় পত্র, ইংরেজি ১ম ও ২য় পত্রের খামটি কৌশলে সরিয়ে ফেলেন। এসময় কেন্দ্রে দায়িত্বরত ট্যাগ অফিসার বোর্ডের দেয়া তালিকা অনুযায়ী পাঠানো প্রশ্নেপত্রের খাম গণনা করার নিয়ম থাকলেও তারা দায়িত্ব অবহেলা করে তা গণনা করেননি। পরে প্রধান শিক্ষক কয়েকজন শিক্ষকের সহায়তায় ফাঁস করা প্রশ্নপত্রের উত্তরমালা তৈরী করে ঐ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলাদা আলাদা চুক্তি মোতাবেক সবসেট ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা মূল্যে বিক্রি করেন। প্রশ্নফাঁসের ঘটনাটি স্থানীয় সাংবাদিকদের নজরে এলে বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে অবগত করা হলে তারা প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেন। পরে ইংরেজি ২য় পত্র পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় নড়েচড়ে বসেন পুলিশ ও প্রশাসন। মঙ্গলবার (২০ সেপ্টেম্বর) ইংরেজি ২য় পত্র পরীক্ষার দিন উপজেলা নির্বাহী অফিসার দীপক কুমার দেব শর্মা, সহকারী পুলিশ সুপার মোর্শেদুল হাসান, ওসি আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে একটি দল প্রধান শিক্ষকের কক্ষে অভিযান চালিয়ে গণিত, কৃষি বিজ্ঞান, পদার্থ বিজ্ঞান ও রসায়নের প্রশ্নপত্র পায়। এ সব বিষয়ের পরীক্ষা এখানো হয়নি।
উল্লেখ্য, পুলিশ জানতে পারে একইভাবে ইংরেজি ১ম পত্রের পরীক্ষার প্যাকেটে এই প্রশ্নগুলো ঢুকানো ছিলো। আর এ প্রশ্নগুলো প্রধান শিক্ষকের কক্ষে রয়েছে নিশ্চিত হয়েই তারা অভিযান চালান। পরে বিকালে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহমান ও প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানকে থানায় আনলেও রাতে প্রধান শিক্ষককে আটক করা হয় এবং মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে ছেড়ে দেয়া হয়। পরে ইংরেজি শিক্ষক আমিনুর রহমান রাসেল, চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক জোবায়ের হোসাইনকে আটক করে এবং বুধবার ভোরে হামিদুল ইসলাম ও সোহেল আল মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসে। মামলার অপর আসামী ক্লার্ক আবু হানিফ পলাতক রয়েছে। প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় মঙ্গলবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম, পুলিশ সুপার আল আসাদ মোঃ মাহফুজুল ইসলাম, দিনাজপুর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান কামরুল ইসলাম ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার দীপক কুমার দেব শর্মা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কক্ষে প্রায় তিন ঘন্টাব্যাপি রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন।
রাতের আধারে মিডিয়াকর্মীদের প্রশ্ন থেকে বাঁচতে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর কামরুল ইসলাম দৌঁড়ে পলায়ন করেন। কেন্দ্র সচিব ও দুই সহকারী শিক্ষককে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, সচিব এবং জেলা শিক্ষা অফিসার উপজেলা পরিষদে যান। পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে শিক্ষা বোর্ড চেয়ারম্যান, সচিব, জেলা প্রশাসকসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা উপজেলা পরিষদ ত্যাগ করেন। ঘটনাটি ঘটেছে মঙ্গলবার মধ্যরাতে। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় এসএসসি পরীক্ষার ইংরেজি ১ম এবং ২য় পত্রের প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ভূরুঙ্গামারী নেহাল উদ্দিন পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার ১৯সেপ্টেম্বর ইংরেজি ১ম পত্র এবং ২০ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ইংরেজি ২য় পত্রের হুবহু হাতে লেখা প্রশ্নপত্র হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্নভাবে পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের হাতে চলে যায়। পরীক্ষার আগের রাতে ফাঁস হওয়া উত্তর পত্রের সাথে পরের দিন পরীক্ষার প্রদত্ত প্রশ্নপত্রের হুবুহু মিল পাওয়া যায়। ফলে সামাজিক মাধ্যমে এসব উত্তর পত্র ছড়িয়ে পড়ায় তা নেবার জন্য শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকগণ ছুটোছৃুটি করেন। প্রতিটি উত্তর কপি ২শ হতে ৫শ টাকায় বিক্রি হয় গোপনে। মঙ্গলবার রাতেই দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর কামরুল ইসলাম, সচিব প্রফেসর জহির উদ্দিন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম, পুলিশ সুপার আল আসাদ মো: মাহফুজুল ইসলাম, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার শামছুল আলমসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা মধ্যরাত পর্যন্ত তদন্ত শুরু করেন। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় অনেক নাটকীয়তা শেষে মধ্যরাতে এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে নেহাল উদ্দিন পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্র সচিব লুৎফর রহমান, একই বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক রাসেল আহমেদ এবং ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের সহকারী শিক্ষক জোবায়েরকে আটক করা হয়।
বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্রে জানাযায়, ওই কেন্দ্রে উপজেলার পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিচ্ছে। আর নেহাল উদ্দিন পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিচ্ছে পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। পরীক্ষা শুরুর কয়েখ ঘন্টা আগে প্রশ্নপত্রের ছবি তুলে তা কেন্দ্রের বাইরে পাঠানো হয়। পরে সেই প্রশ্নের হাতে লেখা কপি চুক্তি করা শিক্ষার্থীদের মাঝে বিলি করা হয়। এ ঘটনায় কেন্দ্র সচিবসহ পরীক্ষা পরিচালনায় থাকা একাধিক শিক্ষক জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নেহাল উদ্দিন পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পরীক্ষার্থী সুমন বলেন, আমি এই কেন্দ্র থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছি। হল রুমে অনেক শিক্ষার্থীর আলোচনা করে তারা প্রশ্নের উত্তর পত্র পেয়েছে ২শ হতে ৫শ টাকায়। আমাকেও নিতে বলেছে অনেকেই। এভাবে যদি পরীক্ষার প্রশ্ন আউট হয় তাহলে আমরা ভালো পরীক্ষা দিয়ে কি লাভ?
পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে চানাচুর বিক্রেতা মিঠু মিয়া বলেন,দু’দনি থেকে পরীক্ষার্থীদের অভিভাবকরা চানাচুর খেতে এখানে তারা গল্প করেন প্রশ্ন পত্র ফাঁস হয়েছে। তারা ২শ হতে ৫শ টাকায় কিনতে পাওয়া যায় বলেও গল্প করেছিলেন। তবে কেনা-বিক্রি করা আমি দেখিনি।
ইংরেজি প্রভাষক মাইদুল ইসলাম মুকুল বলেন, আমি এইচএসসি ব্যাচের শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াই। সেখানকার এবং কলেজের অনেক শিক্ষার্থী আমার নিকট হাতে লেখা প্রশ্ন নিয়ে আসে সমাধানের জন্য। পরে তাদের কাছে জানতে পারি কুড়িগ্রাম, রংপুর,ভূরুঙ্গামারী থেকে তাদের বিভিন্ন বড় ভাইদের মাধ্যমে এগুলো পেয়েছে। বিষয়টি স্থানীয় প্রেসক্লাবসহ প্রশাসনকে অবহিত করি।
এই বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুর রহমান বলেন,আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি ভূরুঙ্গামারী থেকে কোন প্রশ্ন পত্র ফাঁস হয়নি। পরীক্ষার শুরুর কয়েক ঘন্টা আগে হাতে লেখা উত্তর পত্রের সাথে পরীক্ষার প্রশ্নের হুবহু মিল থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, মিল-অমিল আছে কিনা আমার দেখার বিষয় না? এটা সরকারের অনেক বিভাগ আছে,পুলিশ আছে তাদের দায়িত্ব।
ভূরুঙ্গামারী সহকারী পুলিশ সুপার মোরশেদুল হাসান বলেন, আটক তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে মামলা হয়েছে। তদন্ত চলছে।
কুড়িগ্রাম পুলিশ সুপার আল আসাদ মোঃ মাহফুজুল ইসলাম জানান, পরীক্ষার এ কার্যক্রমে পুলিশের নিরাপত্তা দেয়া ছাড়া অন্য কাজ নেই। আমরা সেটি নিশ্চিত করেছি। প্রশ্ন ফাঁস কিংবা জালিয়াতির ঘটনা ঘটালে তার দায় পরীক্ষা ম্যানেজমেন্ট সংশ্লিষ্টদের। মামলা হয়েছে। আমরা তদন্ত করছি। সংশ্লিষ্ট সকলকে আইনের আওতায় আনা হবে। মুল হোতাকেও সনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে আমি নিজে মনিটরিং করছি।