• সোম. জুন ২৭, ২০২২

ঈদকে সামনে রেখে তেলের বাজারে অরাজকতা

ঈদকে সামনে রেখে তেলের বাজারে অরাজক অবস্থা তৈরি করা হয়েছে। ধীরে ধীরে বাজার থেকে উধাও হয়ে যাচ্ছে ভোজ্যতেল। আবারো সক্রিয় হয়ে উঠেছে ভোজ্যতেলের বাজারের অসাধু চক্র। ওই চক্রের কারসাজিতে ভেঙ্গে পড়েছে ভোজ্যতেলের সরবরাহ চেইন। ফলে তীব্র সঙ্কটের মুখে সব ধরনের ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্টরা ভোক্তা অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আগেই সরবরাহ বাড়িয়ে ভোজ্যতেলের বাজার দ্রুত স্বাভাবিক করার পরামর্শ দিয়েছে। বর্তমানে মিলগুলো নিজেরা খুচরা পর্যায়ে কিছু ভোজ্যতেল সরবরাহ করলেও চাহিদার তুলনায় তা খুবই নগণ্য। ফলে দিন দিন সঙ্কট চরম আকার ধারণ করেছে। মিল মালিকরা ভোজ্যতেলের আন্তর্জাতিক মূল্য টনপ্রতি ১ হাজার ৮৭০ ডলারের সমন্বয় করে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য নির্ধারণ করতে চাচ্ছে। আর ওই কারণেই মিলগুলো সরকার নির্ধারিত দামে তেল সরবরাহ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। ব্র্যান্ডভেদে বোতলজাত কিছু ভোজ্যতেল নির্ধারিত দামে বিক্রি হলেও খোলা সয়াবিন ও পামওয়েল অনেক বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। ভোজ্যতেল বাজার সংশ্লিষ্টদের সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে দেশের কোথাও সরকার নির্ধারিত দামে খোলা ভোজ্যতেল মিলছে না। বরং সরবরাহ কমায় খোলা পামওয়েল ও সয়াবিন তেল অনেকটাই উধাও হয়ে গেছে। পাইকারি বাজার ঢাকার মৌলভীবাজারে ভোজ্যতেল বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ওই মার্কেটের পাইকারি ব্যবসায়ীরা মিল থেকে ভোজ্যতেলের সরবরাহ পাচ্ছে না। ঢাকার মতো দেশের অন্যান্য জেলা পর্যায়েও তেলের সরবরাহ কমে গেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ভোজ্যতেল নিয়ে বড় ধরনের ভোক্তা অসন্তুষ্ট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের বাজারগুলোতে খোলা সয়াবিন ও পামওয়েলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে বিক্রি হচ্ছে ভোজ্যতেল। সরকারি বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ টিসিবির তথ্যানুযায়ী, খুচরা বাজারে সর্বশেষ প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন ১৫৫-১৫৮, পামওয়েল লুজ প্রতি লিটার ১৪৫-১৪৮, পামওয়েল সুপার প্রতি লিটার ১৪৮-১৫০, সয়াবিন তেল পাঁচ লিটারের বোতল ৭৪০-৭৬০ এবং প্রতি লিটার এক লিটারের বোতল ১৬০-১৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে ঢাকার বাজারে খোলা সয়াবিন আরো বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে জানা যায়। 
সূত্র জানায়, চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে মিলাররা পাইকারি ব্যবসায়ীদের কিছু ভোজ্যতেল সরবরাহ করলেও এখন তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে কোন ভোজ্যতেল না থাকায় খুচরা ব্যবসায়ীরাও তেল পাচ্ছে না।  পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহ বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। আর দ্রুত সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ভোজ্যতেলের সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করবে। কিন্তু মিল মালিকরা সরকার নির্ধারিত দামে আর ভোজ্যতেল বিক্রি করতে চাচ্ছে না। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। মূলত ওই দাম কার্যকর করতেই মিল থেকে সরবরাহ বন্ধ করে সঙ্কট তৈরি করা হচ্ছে। দ্রুত এ বিষয়ে বৈঠক করে সমাধানে পৌঁছাতে হবে। অন্যথায় যে কোন সময় বাজার ভোজ্যতেল শূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র আরো জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিনের দাম বেড়েছে এমন অজুহাতে আমদানিকারক ও উৎপাদনকারীরা দেশের বাজারে সয়াবিন তেলের দাম আরো বাড়াতে চায়। সম্প্রতি ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে আমদানিকারক ও মিল মালিকদের সঙ্গে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের বৈঠকেও এসব দাবি করা হয়। ওই সময় মিল মালিকরা সয়াবিন তেলের দাম সমন্বয় বা বাড়ানোর অনুরোধ জানায়। বৈঠকে সিটি, মেঘনা, এস আলম, বসুন্ধরা ও টি কে গ্রুপের প্রতিনিধিরা অংশ নেয়। তারা আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে ভোজ্যতেলের বাজার সমন্বয় করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানায়। আর দ্রুত সময়ে সমন্বয় না হলে বাজারে আবারো সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়। মূলত তারপর থেকেই বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে সরবরাহ কিছুটা কমিয়ে বাজারে আতঙ্ক তৈরি করে দাম বাড়ানো হয়েছে। আর এর আগেই কোম্পানির লোক জানিয়ে দিয়েছে তেলের দাম বাড়বে। আর এখন বাড়তি দাম নেয়া হচ্ছে। যে কারণে খুচরা পর্যায়ে ভোজ্যতেলের দাম বেড়ে গেছে।
এদিকে মিল মালিকদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিনের দাম বেড়েছে। সরকার যখন ভ্যাট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় তখন প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিনের দাম ছিল এক হাজার ৪০৭ মার্কিন ডলার। তবে বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে এক হাজার ৮৭০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। ফলে সরকার ভ্যাট প্রত্যাহার করলেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত দামে সয়াবিন তেল বিক্রি করায় মিল মালিকদের লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে। দেশে দৈনিক ৫ হাজার মেট্রিক টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। তার জোগান হিসেবে পর্যাপ্ত মজুদ মিল মালিকদের কাছে আছে। তবে ভোক্তা অধিদফরের পক্ষ থেকে বলা হয়, ঈদের পর মে মাসে ভোজ্যতেলের দাম সমন্বয় নিয়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তার আগে বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই।
অন্যদিকে দ্রুত ভোজ্যতেলের সরবরাহ চেন স্বাভাবিক করতে অতিসম্প্রতি ঢাকার পাইকারী বাজার পরিদর্শনে যান জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান। ওই সময় তিনি পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকও করেন। তবে ওই বৈঠক  ফলপ্রসূ হয়েছে বলে মনে করছেন না ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, মিলারদের কারসাজির কারণে ভোজ্যতেলের সরবরাহ চেন পুরোপুরি ভেঙ্গে গেছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান জানান, ঈদের আগে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর কোন সুযোগ নেই। এ বিষয়টি ভোক্তা অধিদফতর থেকে ব্যবসায়ীদের স্পষ্ট জানিয়ে দেয়া হয়েছে। বাজারে তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক করতে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ঈদের আগে দাম বাড়ানোর আর কোন সুযোগ নেই। সরকার নির্ধারিত দামেই ভোজ্যতেলে বিক্রি করতে হবে। মিল থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা যাতে তেল আনতে পারে সে বিষয়ে মিল মালিকদের নির্দেশ দেয়া হবে। তাছাড়া ভ্যাট কমানোর সুবিধা নিয়ে দ্রুত ভোজ্যতেল আমদানির জন্য পরামর্শ দেয়া হয়েছে। 
এ প্রসঙ্গে কনজ্যুমারস এ্যাসোসিয়েন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর সভাপতি গোলাম রহমান জানান, ভোক্তাদের সহনীয় মূল্যে ভোজ্যতেল খাওয়ানো সরকারের দায়িত্ব। ইতোমধ্যে ভ্যাট কমানোসহ বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হলেও খুচরা পর্যায়ে সেভাবে দাম কমেনি। এখন আবার ভোজ্যতেলের সঙ্কট দেখা যাচ্ছে। তাতে ভোক্তা অসন্তোষ বাড়ছে। ভোক্তার স্বার্থ সার্বিকভাবে দেখা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে সমন্বয় সাধন করার জন্য একক কোন মন্ত্রণালয় নেই। অথচ ভোক্তা হলো দেশের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক গোষ্ঠী।