• মঙ্গল. জুলা ৫, ২০২২

অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে বাংলাদেশের পরিবহন ব্যয়

মে ১৫, ২০২২

অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে বাংলাদেশের পরিবহন ব্যয়। মূলত যানজট, পরিবহন খাতের অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জ¦ালানির চাহিদা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশে পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। একজন মানুষ যা আয় করে তার ১০ শতাংশ পরিবহন খাতে ব্যয় হলে পরিবহন ব্যয় স্বাভাবিক পর্যায়ে রয়েছে বলা হয়। কিন্তু রাজধানী ঢাকাসহ দেশের শহরাঞ্চলে ওই ব্যয় ইতোমধ্যে ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। গত এক দশকে দেশে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভোক্তা মূল্য সূচকের (সিপিআই) পরিবহন ও যোগাযোগ উপখাতের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত এক দশকে সিপিআই পরিবহন ও যোগাযোগ সূচক বৃদ্ধির দিক থেকে শীর্ষস্থানীয় পর্যায়ে রয়েছে বাংলাদেশ। পরিবহন খাত সংশ্লিষ্ট এবং বিশেষজ্ঞদের সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ঢাকা-রাজশাহী রুটের নন-এসি বাসের একটি আসনের ভাড়া এক দশক আগেও ৩০০ টাকার কম ছিল। বর্তমানে ঢাকা-রাজশাহীর মধ্যে ভ্রমণ করতে একজন যাত্রীকে গুনতে হচ্ছে ৬০০ টাকা। এক দশকের ব্যবধানে দেশের অন্যতম ব্যস্ত ওই রুটে বাস ভাড়া বাড়ার হার প্রায় ১০০ শতাংশ। আর ২০১১ সালের দিকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বন্দর পর্যন্ত একটি মাঝারি ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানের (১০ টন) স্বাভাবিক ভাড়া ছিল ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। বর্তমানে ওই রুটে মাঝারি ট্রাক/কাভার্ড ভ্যানের স্বাভাবিক ভাড়া ১২-১৩ হাজার টাকা। সড়কপথের মতো নৌপথেও গত এক দশকে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। রিকশা-ভ্যান থেকে শুরু করে ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ড ভ্যান অর্থাৎ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের সব মাধ্যমেই বাংলাদেশে গত এক দশকে পরিবহন ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) দেশের গণপরিবহনের ভাড়া নির্ধারণ করে। আর ওই ভাড়ার হারের সঙ্গে মিল রেখে পণ্যবাহীসহ সব ধরনের স্থল পরিবহনের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ গত বছরের নভেম্বরে জ¦ালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে বিআরটিএ গণপরিবহনের ভাড়া ২৭ শতাংশ বাড়িয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। আর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) দায়িত্ব নৌপথে পণ্য পরিবহনের ভাড়া নির্ধারণ করা। জ¦ালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষিতে গত বছর ১০০ কিলোমিটার দূরত্বে ৩৫ শতাংশ ও ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের লঞ্চ ভাড়া প্রায় ৪৩ শতাংশ বাড়ানো হয়। একই সাথে প্রায় সমহারে বাড়ে পণ্যবাহী নৌযানের ভাড়াও।
সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী দেশে গত এক দশকে সিপিআই পরিবহন ও যোগাযোগ সূচক ১৯১ পয়েন্ট বেড়েছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশে সিপিআই পরিবহন ও যোগাযোগ সূচকের অবস্থান ছিল ১২৭ পয়েন্ট। চলতি বছরের মার্চে তা বেড়ে ৩১৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। বিবিএস ২০০৫-০৬ অর্থবছরকে ভিত্তি হিসেবে ধরে সিপিআই প্রকাশ করে আসছে। ভিত্তি বছরে সূচকের মান ধরা হয় ১০০ পয়েন্ট। তাছাড়া বিশ্বের ১৯৬টি দেশের সিপিআই পরিবহন ও যোগাযোগ সূচক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক তথ্য সেবা প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং ইকোনমিকসও বলছে, এক দশকে সিপিআই পরিবহন ও যোগাযোগ সূচক বৃদ্ধির দিক থেকে শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
এদিকে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে যানজট একটি বড় সমস্যা। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যানজট সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জ¦ালানি তেলের চাহিদা বৃদ্ধি ও পরিবহন খাতের অনিয়ম-বিশৃঙ্খলার কারণেও দেশে পরিবহন খাতে ব্যয় বাড়ছে।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের মতে, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব শুধু মানুষের দৈনন্দিন জীবনেই পড়ছে না, দেশের অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহ-সভাপতি শহিদউল্লাহ আজিম জানান, বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি আমদানি-রফতানি। পরিবহন ব্যয় বেশি হলে আমদানি-রফতানিতে তার প্রভাব সরাসরি পড়ে। একইভাবে কৃষিসহ স্থানীয় বাণিজ্যেও বিরূপ প্রভাব ফেলে। যার নেতিবাচক প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেই পড়ে।
এ প্রসঙ্গে দেশের সড়ক পরিবহন খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার জানান, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার যে প্রবণতা তা বাংলাদেশের সব খাতেই রয়েছে। পরিবহন খাত আলাদা কিছু নয়। তার বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সময় গণপরিবহনে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ ওঠে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে বিআরটিএ সব সময় কাজ করে যাচ্ছে। নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে জরিমানাও করা হচ্ছে।